শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ০৮:১৬ পূর্বাহ্ন

ঈদ যাত্রায় চিরচেনা ভোগান্তি: ট্রেনে উঠতে যুদ্ধ,মহাসড়কে যানজট; লঞ্চে বাড়তি ভাড়া

এপ্লাস অনলাইন
  • আপডেট সময় : শনিবার, ৯ জুলাই, ২০২২

 

 

ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য ঘরমুখো মানুষের অস্বাভাবিক চাপ । রাজধানীর সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী বাস টার্মিনাল এবং রেলস্টেশনগুলোয় এ চিত্র. ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যাওয়া পরিবহনগুলোর বেশিরভাগ বাসের টিকেট বৃহস্পতিবারের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।

শুক্রবার বাস টার্মিনালে গিয়ে টিকেট না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন বহু মানুষ। অগ্যতা অনেকেই ট্রাক-পিকআপে চড়ে বাড়ির পথে রওনা দেন। তাতেও গুনতে হয় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ ভাড়া। শনিবারেও রয়েছে এই চিত্র।

এদিকে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। ভিড়ের কারণে দরজা দিয়ে উঠতে না পেরে জানালা দিয়ে উঠেছেন। আর আসনবিহীন গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে এবং ছাদে উঠেছেন ঝুঁকি নিয়ে। লঞ্চে গত কয়েকদিন যাত্রীদের ভিড় না থাকলেও শুক্রবার বেশ চাপ ছিল। সুযোগ বুঝে বাড়তি ভাড়াও আদায় করেছেন লঞ্চ মালিকরা।

রাজধানীর সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী বাস টার্মিনালে ঘুরে দেখা গেছে, টার্মিনালগুলোয় বাসের আসনের চেয়ে যাত্রীদের উপস্থিতি ছিল বেশি। টার্মিনালে ঢাকার বাইরে থেকে বাস এসে মানুষ ভর্তি করে আবার ঢাকার বাইরের গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছে। তবুও টার্মিনালে মানুষের চাপ কমেনি।

গাবতলী টার্মিনালে দেখা যায়, শত শত মানুষ বাসের কাউন্টারে গিয়ে রংপুর, বগুড়া, লালমনিরহাট, গাইবান্ধাসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার টিকেট চাচ্ছেন; কিন্তু পাচ্ছেন না। নিরুপায় হয়ে অনেকেই ট্রাকে চড়ে রওয়ানা দেন। এ সুযোগ নেয় গরু নিয়ে আসা ফিরতি ট্রাক।

এভাবে ট্রাকে ওঠা গফুর নামের এক যাত্রী বলেন, রংপুরে যাওয়ার টিকেট নেই। খালেক পরিবহনে টিকেট পাওয়া গেলেও ১৬০০ টাকা চায়। তাই ৫০০ টাকা দিয়ে ট্রাকে উঠেছি।

এ সময় রংপুর বগুড়ার উদ্দেশে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে অন্য সময়ে গাবতলী-যাত্রীবাড়ী রুটে চলা ৮ নম্বর পরিবহনের একাধিক বাসকে। এর একটি বাসের যাত্রী মো. ইসহাক জানান, রংপুর রুটের বাসের টিকেট না পেয়ে এ বাসে উঠেছি। ভাড়া নিয়েছে এক হাজার টাকা। এত ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কনাডাক্টর বাসেত বলেন, ফেরার সময় খালি ফিরতে হবে, আবার রুটের বাস না হওয়ায় পথে পথে অনেক কিছু ম্যানেজ করতে হবে, তাই ভাড়া বেশি।

গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে হেঁটেও অনেককে আমিন বাজারের উদ্দেশে যেতে দেখা যায়, যদি বিকল্প কোনো পরিবহনে ভেঙে ভেঙেও যাওয়া যায়, সে আশায়।

ঈদযাত্রায় যানবাহনের চাপে পড়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক ও পদ্মা সেতু টোল প্লাজা। ভোর থেকেই দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ধলেশ^রী টোল প্লাজা ও মাওয়া প্রান্তের পদ্মা সেতু টোল প্লাজায় যানবাহনের চাপ দেখা যায়। দুই টোল প্লাজার আশপাশে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির ধীরগতি ছিল।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ায় চাপ বেড়েছে। তবে টোল আদায় ও নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োজিত রয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সড়কের টোল প্লাজার ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম জানান, রাতভর পাঁচটি লাইন সক্রিয় থাকলেও ভোর থেকে যানবাহনের চাপ বাড়ে।

এদিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে বের হতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে এবং ভাড়াও বেশি আদায় করা হয়। আবার অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া দিতে চেয়েও বাসের টিকেট পায়নি। সবচেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ঢাকা-বরিশাল রুটে। ঈদ উপলক্ষে ৪০০ টাকার ভাড়া ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অনেকে আবার বাড়তি ভাড়া দিয়েও সিট পাননি। বনেটে, বাসের দুই অংশের সিটের মাঝে মোড়ায় বসে গেছেন।

যাত্রাবাড়ী টার্মিনালে দেখা গেছে, পদ্মা সেতু পার হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত জনপ্রতি পিকআপ ভাড়া ৫০০ টাকা করে দিয়ে বাড়ির পথে যাচ্ছে লোকজন।

বাসে বেশি ভাড়া নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মুখপাত্র শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী সময়ের আলোকে বলেন, ‘ফিল্ডে আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট আছে, ভিজিলেন্স টিম আছে প্রতিটি টার্মিনালে, আমাদের কন্ট্রোল টিম আছে, পুলিশ আছে, যাত্রীরা তাদের কাছে বেশি ভাড়ার অভিযোগ জানালে সমাধান পাবেন। এখন ঈদের সময়, এটা তো স্বাভাবিক সময় না। তো ১০ জনের মধ্যে দুজন ধরা পড়তেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সব জায়গায় শতভাগ টহল দেওয়া সম্ভব না। তবে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করলে সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

শুক্রবার সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ কমলাপুরে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ট্রেন প্লাটফর্মে আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি। এ অবস্থা ছিল প্রায় সব ট্রেনেই। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের দিকে যাত্রা করা ট্রেনগুলোয়।

ভিড়ের বিষয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গতকাল থেকে আজ সকাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার মানুষ ট্রেনে রওনা করেছেন। যার প্রভাব কিছুটা পড়েছে। এত বেশি যাত্রীর চাপ এবং মানুষের যে স্রোত, সেটা ঠেকানো যাচ্ছে না। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জিআরপি পুলিশ সবাই যাত্রী চাপের কাছে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রেনের ছাদ থেকে যাত্রী নামানো যাচ্ছে না।’

এদিকে বেশিরভাগ ট্রেনেরই শিডিউল বিপর্যয় মুখে পড়েছে। প্রায় প্রতিটি ট্রেন ৩০ মিনিট থেকে ৪ ঘণ্টা দেরিতে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। সকালে যাত্রার শুরুতে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৬টায় ছাড়ার কথা থাকলেও সাড়ে তিন ঘণ্টা দেরি করে সাড়ে ৯টার দিকে স্টেশন ত্যাগ করে। নীলফামারীর চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও পৌনে ১০টার দিকে ছেড়ে যায়। একতা এক্সপ্রেস ট্রেন ৪ ঘণ্টা দেরি করে দুপুর ২টায় ছাড়ে।

খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস সোয়া দুই ঘণ্টা দেরি করে সোয়া ১০টার দিকে ছেড়ে যায়। এভাবে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন কর্ণফুলী কমিউটার, রাজশাহীগামী বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি, মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসসহ প্রায় সব ট্রেনই বিলম্বে ছেড়ে যায়।

ঈদে বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যানজট তীব্র হয়েছে। শুক্রবার বিকালে সেতুর পূর্বপ্রান্ত থেকে ৩৫ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাসড়কে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

পুলিশ সূত্র জানায়, সকালে সেতুর পশ্চিম প্রান্তে বাস ও পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষের কারণে যানজট সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়। এই দুর্ঘটনার কারণে ভোরে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সেতুতে টোল আদায় বন্ধ থাকে। ফলে সকালে যানজট সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার কালিহাতীর এলেঙ্গা ছাড়িয়ে যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহনের চাপ বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে যানজটও দীর্ঘ হতে থাকে। বিকাল নাগাদ দীর্ঘ এই যানজট টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই ২৪ ঘণ্টায় সেতুর ওপর দিয়ে উত্তরবঙ্গগামী ২৫ হাজার ১১৩টি যানবাহন যানবাহন পার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয় ১ কোটি ৭৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। অপরদিকে ঢাকাগামী ১৮ হাজার ৪৮২টি যানবাহন পার হয়েছে। টোল আদায় হয় ১ কোটি ৬০ লাখ ১৭ হাজার ৮০০ টাকা।

অপরদিকে চন্দনা চৌরাস্তা থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রমোড় পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে যানজটের সৃষ্টি হয়। তাই এ মহাসড়ক দুটিতে ঘরমুখো মানুষ বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে পোহাতে হয় ভোগান্তি। টঙ্গী ব্রিজ থেকে চন্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কে বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় মহাসড়কের মাঝখানের দুটি লেন বন্ধ। তাই মহাসড়কে পূর্ব এবং পশ্চিম পাশের দুটি সিঙ্গেল লেনে যানবাহন চলাচল করায় এর সারি বেশ দীর্ঘ হয়।

গত কয়েকদিনের তুলনায় ঢাকার সদরঘাটে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীর চাপ বাড়ে। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, নিয়ম না মেনে বেশি ভাড়া আদায় করা হয়। সদরঘাট এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষ দলে দলে টার্মিনালে প্রবেশ করছেন। যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে হাঁকডাকে ব্যস্ত ছিলেন লঞ্চের স্টাফরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই রকম আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Aplusnews.Live
Design & Development BY Hostitbd.Com

অনুমতি ছাড়া নিউজ কপি দন্ডনীয় অপরাধ। কপি করা যাবে না!!