বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:০৪ পূর্বাহ্ন
নিউজ ফ্লাশ
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পঞ্চগড়ের নৌকাডুবির খবর পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি ট্রাজেডি: অর্ধশত মরদেহ উদ্ধার বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন : বেরোবি উপাচার্য স্বজনদের আহাজারিতে ভারি করতোয়ার পাড় পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি: দিনাজপুরের পুনর্ভব নদীতে ভেসে এলো ৮ জনের লাশ করতোয়ার পাড়ে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি, মৃত্যু বেড়ে ৩৯ পঞ্চগড়ে মন্দিরে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে শিশুসহ ২৪ জনের মৃত্যু হিজাব ইস্যুতে উত্তাল ইরান: নারীসহ ৭০০ বিক্ষোভকারী গ্রেফতার, নিহত ৩৫ শারদীয় দুর্গাপূজা: হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রী পারাপার বেড়েছে ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য, বেরোবি শিক্ষার্থী আটক

`বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ প্রতিরোধের প্রথম প্রহর

এপ্লাস অনলাইন
  • আপডেট সময় : শনিবার, ২৬ মার্চ, ২০২২
‘রাত তখন আনুমানিক দশটা। চারদিক থমথমে অবস্থা। ঢাকার তেজগাঁও এলাকা থেকে ওয়্যারলেসে তখন প্রথম একটি বার্তা আসে। বলা হয়- ‘মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের ভেতরে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পাকস্তানি সেনাদের হামলার আশঙ্কা রয়েছে।’ মেসেজটি পাওয়ার পরপরই রাজারবাগে পুলিশ সদস্যরা ছোটাছুটি শুরু করেন। ওই সময়ে একজন পুলিশ সদস্য পুলিশ লাইন্সের পাগলা ঘণ্টা বাজাতে থাকেন। তখন যে যেখানে, যে অবস্থায় ছিলেন সবাই ছুটে আসেন এবং চিৎকার দিয়ে সবাই বলতে থাকেন, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ এ ধরনের স্লোগানে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স উত্তপ্ত হতে থাকে। এরপর পুলিশ সদস্যরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বেরিকেড তৈরি করে অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ভারী অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে রাজারবাগে হামলা চালায়। প্রতিরোধের লক্ষ্যে পুলিশও সাধ্যমতো গুলি চালাতে থাকে। এভাবে ভোর রাত ৪টা পর্যন্ত প্রতিরোধ যুদ্ধ চলতে থাকে। ওই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন পুলিশের অন্তত দেড়শ সদস্য।
দৈনিক সময়ের আলোকে এভাবেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের সেই বর্ণনা করেছেন অংশগ্রহণকারী প্রতিরোধ যোদ্ধা বাংলাদেশ পুলিশের গর্বিত সদস্য মো. শাহজাহান মিয়া। যিনি ওই সময়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ওয়্যারলেস অপারেটরের দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে রাজারবাগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলার খবর ছড়িয়ে দিয়ে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন।
শাহজাহান মিয়া ছাড়াও একাধিক প্রতিরোধ যোদ্ধা এখনও জীবিত আছেন। তৎকালীন টগবগে পুলিশ সদস্য নেত্রকোনার কেন্দুয়ার বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া কিংবা কিশোরগঞ্জের মো. আবু শামা, ফারুক ও কাঞ্চন আলীসহ প্রথম প্রতিরোধ যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বর্তমানে প্রায় ২০ জনের মতো প্রতিরোধ যোদ্ধা বেঁচে আছেন বলেও জানা গেছে। যদিও তাদের মধ্যে আবু শামাসহ এমন একাধিক প্রতিরোধ যোদ্ধার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অসুস্থতাজনিত কারণে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
ইতিহাস বিশ্লেষণে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত অভিযানে যে গণহত্যা চালানো হয় তার প্রধান তিনটি লক্ষ্যস্থলের একটি ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স। কী ঘটেছিল সেই রাতে? কীভাবে রাজারবাগে হামলা হলো? কীভাবে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সেসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলেছে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছ থেকে। তাদেরই অন্যতম একজন জীবন্ত কিংবদন্তি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়া।
আলাপকালে প্রথমেই কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে শাহজাহান মিয়া বলেন, ২৫ মার্চ রাতে আমরা বিভিন্নভাবে সংবাদ পাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাজারবাগ আক্রমণ করবে। সেই আলোকে আমরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা রাজারবাগে নিযুক্ত থাকা পাকিস্তানি পুলিশ সদস্যদের কিল-ঘুসি দিয়ে সরিয়ে দিই। এরপর অস্ত্রাগারের চাবি ছিনিয়ে অস্ত্র নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে ভাগ করে প্রস্তুতি নিতে থাকি। আমি নিজে ও আমার এক সহযোদ্ধা মনির দুজনে দুটো রাইফেল এবং ৩০ রাউন্ড করে গুলি নিই। ওয়্যারলেস স্টেশনের দায়িত্ব¡ আমি নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে থাকি। অন্যদিকে আমাদের সঙ্গে যারা অস্ত্র নিয়েছে তারাও পজিশনে চলে গেছে। অভ্যন্তরে ব্যারাকের মূল ভবনের ছাদে, পুকুরপাড়ে বাড়ির পাশে ও রাস্তার পাশে পজিশন নিতে থাকি।
এ ছাড়া স্থানীয় লোকদের সহায়তায় আমাদের অনেকে তখনকার জন হাই স্কুলের (বর্তমানে মার্কেট) ছাদে পজিশন নেয়। তাদের সামনেই ছিল বড় ধরনের একটি ব্যারিকেড। বিভিন্ন গাছপালা, টায়ারসামগ্রী ফেলে দিয়ে বেরিকেট দেওয়া হয়। যাতে পাকিস্তানি সেনাদের গাড়ি এসে সেখানে থামতে হয় এবং সামনের দিকে যাতে অগ্রসর হতে না পারে। এক পর্যায়ে রিজার্ভ অস্ত্র যেখানে ছিল সেটাও ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে দুই থেকে তিনশ ও পরে আরও দুই-তিনশ মোট পাঁচ শতাধিক বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। আনুমানিক রাত সাড়ে ১১টার দিকে বর্বর পাকিস্তানি সেনারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশ দিয়ে মিন্টো রোড হয়ে বেইলী রোড দিয়ে শান্তিনগর-চামেলীবাগ হাই স্কুলের সামনে এসে পৌঁছায়। এরপর শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।
শাহজাহান মিয়া বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা ট্যাঙ্ক, কামানসহ ভারী অস্ত্র নিয়ে একসঙ্গে করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে হামলা চালায়। টার্গেট ছাড়াই এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। তখন ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত একটা ইংলিশ বার্তা প্রদান করি। তা হলো-‘দ্য বেস্ট ফর অল স্টেশনস অব ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, ভেরি ভেরি ইম্পরট্যান্ট মেসেজ ফর ইউ। কিপ নোট, কিপ রিচনিং ওয়াচ। উই আর অলরেডি আন্ডার অ্যাটাক বাই পাক আর্মি। ট্রাই টু সেইভ ইয়র সেল্ফ।’
এরপর আর অপেক্ষা না করে আমি ও সহযোদ্ধা মনির দুজনে দুটি রাইফেল হাতে নিয়ে গুলি করতে করতে আমরা অস্ত্রাগারের পাশ দিয়ে চার তলার ছাদে উঠে যাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই আমাদের আরও ৪০-৫০ জন পুলিশ অপেক্ষা করছে। আমরা পাঁচজন বিশেষ করে আমি, মনির, গিয়াস উদ্দিন, আবু সামা ও সালাম নামে পাঁচজন প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে এগিয়ে যাই এবং পজিশন নিই। সেনাদের আসার অপেক্ষা করতে থাকি। পুলিশের প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি সেনারা রাত ২টা পর্যন্ত রাজারবাগের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। এরপর আরও অত্যাধুনিক অস্ত্র-সরঞ্জাম নিয়ে জড়ো হয়ে গানপাউডার দিয়ে অনেক কিছু জ্বালিয়ে দেয়। আকাশে আগুনের স্ফুলিঙ্গ উড়তে থাকে। গোলার শব্দে এলাকা প্রকম্পিত হতে থাকে। এরপর রাত ৪টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখলে চলে যায়।
জানা যায়, স্বাধীনতার যুদ্ধকালে তৎকালীন বাঙালি পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ হাজার। যার মধ্যে ১৪ হাজার বাঙালি পুলিশ সদস্য দেশমাতৃকার জন্য পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের প্রায় ১১শ সদস্য শহীদ হন। তখনকার সেই ছোট্ট পুলিশ বাহিনীটি এখন বিশাল এক অত্যাধুনিক বাহিনী।
সূত্র

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই রকম আরো সংবাদ

এ প্লাস ডিজিকম সার্ভিস

© All rights reserved © 2020 Aplusnews.Live
Design & Development BY Hostitbd.Com

অনুমতি ছাড়া নিউজ কপি দন্ডনীয় অপরাধ। কপি করা যাবে না!!